সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

waiting-train-dhaka-ctg.jpg

ট্রেন ভ্রমণের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও অসুস্থ রেলমন্ত্রীর জন্য দোয়া

কুমিল্লায় পৌঁছালাম ৫টা ২৫ মিনিটে। শুনেছিলাম সেখান থেকে ৩ ঘন্টায় পৌঁছে যাব চট্টগ্রামে। কথায় বলে - শোনা কথায় কান দেবেন না। কথাটা আরেকবার সত্য প্রমাণিত হলো। আমরা চট্টগ্রামে পৌঁছালাম রাত পৌনে দশটায়।

শত প্রতিকূলতার মাঝেও মেজাজ ঠিক রেখে চলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ আমি! প্রায় ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা! তবু নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছে। এ সময়ই একজনের ফোন।

- কমলাপুর রেল স্টেশনে কি করছ?
- আমি এখানে তা তুমি জানলে কি করে?
- টিভিতে দেখাচ্ছে।

সাড়ে তিন ঘন্টা ধরে স্টেশনে। টিভি ক্যামেরায় আমি ধরা না পড়লে পড়বেটাইবা কে! সফর শুরু হওয়ার আগেই ক্লান্ত-শ্রান্ত এই আমি আর প্রশ্ন করিনি কোন টিভিতে তুলে ধরা হয়েছে আমার মতো শত-সহস্র দুর্ভাগা যাত্রীর মলিন মুখ।

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ‘মহানগর প্রভাতী’ ছাড়ার কথা ৭টা ৪০ মিনিটে। সেই ট্রেন ছাড়ল ১১টায়। আমরা স্টেশনে পৌঁছেছিলাম সেই সোয়া ৭টার দিকে। বউ-বাচ্চা নিয়ে প্রায় চার ঘন্টা স্টেশনে অপেক্ষা করা যে কতটা অস্বস্তিকর তা কেবল ভুক্তভোগীই জানেন। প্রথম শ্রেণীর যাত্রীদের বিশ্রামাগারেও বসার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। টয়লেটের সামনে বিশাল লাইন। এরসঙ্গে দুষ্টু ও চঞ্চল প্রকৃতির দুই বাবুর নানা আবদার।

হঠাৎই শোনা গেল শোরগোল। ভদ্র পোশাকের একদল যুবক প্লাটফরম থেকে শ্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে আসছে গেইটের দিকে। অবাক হলাম। দেশেতো মিটিং-মিছিল নেই। এই সাহসীরা কারা? প্লাটফরমেই মিছিল শুরু করেছে যেখান থেকে পুলিশের তাড়া খেয়ে দৌড়ে পালানোর কোনো ধরনের সুযোগ নেই! একটু খোঁজ নিতেই জানতে পারলাম - ওরা ছাত্রলীগের নেতা। চট্টগ্রাম থেকে একটি ট্রেনের দু’টি কামরায় চেপে এসেছে সম্মেলনে যোগ দিতে। আর ট্রেন থেকে নেমেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে শ্লোগান দিচ্ছে তারা। ওরা যে ট্রেনে করে এসেছে সেই ট্রেনেরই ফিরতি পথের যাত্রী আমরা।

ট্রেনে ওঠার পর ভাবলাম এই বুঝি শেষ হলো অপেক্ষার পালা-শুরু হবে পথচলা। কিন্তু না। ৪০ মিনিটের মতো বসে থাকতে হলো বদ্ধ কেবিনে। ট্রেন না ছাড়লে যেন এসি ছাড়তেও মানা। বাইরে বৃষ্টি পড়ার পরও তথাকথিত ‘তাপানুকূল’ কামরায় কষ্টদায়ক তাপের অভাব ছিল না প্রায় ৪০ মিনিট।

ভেবেছিলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ট্রেন ভ্রমণটা জমপেশ হবে। এসি (তাপানুকূল) কেবিনের জানালায় বসে উপভোগ করবো গ্রাম-বাংলার নানা রূপ। নরসিংদি, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা আর ফেনীকে দেখবো মনের মতো আপন করে। অবশেষে দেখা হলো সবই কিন্তু সে দেখায় তৃপ্তি নেই। কথা ছিল দেখবো আপন করে। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও আপন ভাবতে পারিনি তাদের। প্রতি মুহূর্তের ভাবনা ছিল ছেড়ে যাবার। কখন শেষ হবে নরসিংদি, কখন ছাড়ব কুমিল্লা। মনে মনে চেয়েছি কোথাও যেন বেশি সময় ধরে ট্রেন থেমে না থাকে।

নরসিংদি পার হয়ে ভৈরব বাজারে পৌঁছালাম বিকেল ২টা ৪০ মিনিটে। ভৈরব ব্রিজ থেকে ডানে তাকিয়ে মনে হলো কোনো সাগর পাড়ি দিচ্ছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছলাম ৩টা ১৫ মিনিটে। থেমে থাকল ১৫ মিনিট। যেখানেই থেমেছে অন্তত ১৫/২০ মিনিট দেরি করেছে। কখনো কখনো হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছে বিশাল বিলের পাশে। কেন এ যাত্রা-বিরতি? অন্য ট্রেনকে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে, তাই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে দীর্ঘক্ষণ।

চলতে চলতে হঠাৎই লক্ষ্য করলাম আমাদের কেবিনের দরজা খোলা যাচ্ছে না। ‘চেকার’কে ঘুষ দিয়ে কেবিনের সামনের করিডরে দাঁড়িয়ে-বসে ‘তাপানুকূল’ কামরার যাত্রী সেজেছেন বহু জন। কেবিন থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। তাদেরকে ডিঙিয়ে করিডর পেরিয়ে টয়লেটে যাওয়ারও সুযোগ নেই। হঠাৎ মনে হলো সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন রেলমন্ত্রীর কথা। তার প্রিয়তমা স্ত্রী দেশবাসীর কাছে মন্ত্রীর জন্য দোয়া চেয়েছেন। মন্ত্রীর অসুস্থতাজনিত অনুপস্থিতিই কি রুগ্ন করে তুলেছে গোটা রেল মন্ত্রণালয়কে?

কুমিল্লায় পৌঁছালাম ৫টা ২৫ মিনিটে। শুনেছিলাম সেখান থেকে ৩ ঘন্টায় পৌঁছে যাব চট্টগ্রামে। কথায় বলে - শোনা কথায় কান দেবেন না। কথাটা আরেকবার সত্য প্রমাণিত হলো। আমরা চট্টগ্রামে পৌঁছালাম রাত পৌনে দশটায়। প্রায় টানা ১২ ঘন্টা কাটলো ট্রেনের ভেতরে। স্টেশনে বসে ছিলাম প্রায় চার ঘন্টা। নিয়ম মেনে চলা কোনো দেশে হলে ফেরত পেতাম ৫০% ভাড়া। ট্রেন থেকে নেমে দেখলাম যেসব নারী-পুরুষ ছাদে বসে আমাদের সহযাত্রী হয়েছিলেন তাদের অবস্থা ভেজা কাকের মতো। একজন হিজাবপরা মহিলাকে দেখলাম ছাদ থেকে নামতে পারছেন না পড়ে যাওয়ার ভয়ে! তাকে নামানোর চেষ্টা চলছে নানাভাবে। দৃশ্যটি দেখে জন্ম নিল অপরাধবোধ। এসি কেবিনে বসে ট্রেন ভ্রমণ আর ভ্রমণ নিয়ে নানা প্রত্যাশাকে মনে হলো বিলাসিতা। সব আক্ষেপ পরাজিত হলো অপরাধবোধের কাছে।

চট্টগ্রামে তখনও বৃষ্টি। ডুবে গেছে শহরের বহু রাস্তা। আমাদের সিএনজি ছুটে চলেছে নাসিরাবাদের দিকে।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

train, delay, waiting, kamlapur, railway, station, chittagong, Dhaka, crowded