সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

PIC_3063.JPG

কুয়ালালামপুর থেকে পেনাং হয়ে লাংকাবি লাংকাবি: যেখানে প্রকৃতি মিশেছে আপন মহিমায়

দেখতে দেখতে সন্ধা নামলো। বন্ধ হয়ে গেলো স্পীড বোর্ড, ব্যানানা বোর্ড প্যারাসুটসহ অন্যান্য যান। এই মূহূর্তে সমুদ্রের মাঝে সূর্য ডোবা দেখতে ইচ্ছে করছে। আবারো মনে পড়ে গেলো প্রিয় মাতৃভূমির অকৃত্রিম সুন্দর কুয়াকাটার কথা। অবহেলা আর অযন্তে যে কুয়াকাটা আজ বিলিন হতে বসেছে।

জর্জটাউনের বোর্ডিং পাস পার হয়ে সুপার ফার্স্ট ফেরি যখন সমুদ্রের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে, একপাশে শহর অন্য পাশে সবুজ পাহাড়। এর ই মাঝ দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু কেডা প্রদেশে সমুদ্রের মাঝের দ্বীপ লাংকাবিতে যাকে এই প্রদেশের রত্ন বলা হয়।

সমুদ্রের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা নৌযানের খোলা ছাঁদে বসার স্বাদ পুরনের জন্য অপেক্ষা করতে হলো প্রায় দেড় ঘন্টা। ব্যাক্তিগত কারন দেখিয়ে ফেরি কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্ত। ততক্ষনে অবশ্য জানালা দিয়ে উপভোগের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। দুপুর ২.৩০মিনিট এ টানা রোদের মধ্যে যাত্রা শুরু হলেও ঘন্টা খানেক পরে রোদের তাপ কিছুটা কমার পর এবার সুযোগ মিললো ছাদে যাওয়ার।

বলা হয় পাহাড়, সমুদ্র আর সমতলভূমির চমৎকার এক দেশ মালয়েশিয়া। আজ দ্বিতীয় বারের মতো সেটা নিজ চোখে দেখলাম। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে সাংবাদিক হিসাবে সাবাহ্ যাওয়ার পথে এমন দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো। আকাশ পথের আড়াই ঘন্টার সে ভ্রমন আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। পেনাং থেকে লাংকাবি যেতে সময় লাগলো সাড়ে তিন ঘন্টা। ফেরি থেকে নামতেই চোখে পড়লো বিশাল আকৃতির ঈগল মুর্তি, টুইন টাওয়ার দেখলে যেমন কুয়ালালামপুর বোঝা যায় ঈগল স্কয়ারও প্রতিনিধিত্ব করে লাংকাবিকে। পর্যটকদের স্বাগত জানাতে ফেরিঘাট থেকে শহরে ঢোকার মুখে প্রবেশপথে বড় বড় অক্ষরে লেখা ওয়েলকাম টু লাংকাবি।

মালয়েশিয়ার অন্যান্য জায়গার তুলনায় এখানে বাংলাদেশীদের সংখ্যা কিছুটা কম। তবে যতোটা শুনেছি ততোটা নয়। আসলে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করে ভালো অবস্থানে গেছে খুব কম বাংলাদেশী। আর যারা আছেন তাদের বেশিরভাগ-ই শ্রমিক শ্রেনীর। গুটি কয়েক বাংলাদেশী বৈবাহিক সূত্রে কিংবা ব্যবসায়ীক সূত্রে এখানে নিজেদের অবস্থান করে নিয়েছেন। এদেরই একজন বোরহান। যিনি বৈবাহিক সূত্রে এখন এখানকার নাগরিক। অল্পতেই বোঝালেন এই দ্বীপে তার ক্ষমতা। জানালেন লাংকাবিতে যতো ট্যাক্সি চলে তার নের্তৃত্বে রয়েছেন তারই শশুর।

আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা ক্ষমতাধর বোরহানের হাত থেকে মুক্ত হয়ে জাকির নামে এক ভদ্রলোকের স্বাক্ষাত পেয়ে গেলাম। আগে থেকেই তার বাংলোতে থাকার সিদ্ধান্ত ছিলো। তবে স্বাক্ষাতে জানালেন, সে সুযোগ মিলছে না। বাংলাদেশ থেকে আসা বড় মাপের একজন ভিআইপি দখল করে রাখবে বাংলো। অগত্যা হোটেল খোঁজা। এ কাজে সার্বিক সহযোগীতা করলেন জাকির ভাই।

সমুদ্রতীরের এই হোটেলটি আমার একবারেই পছন্দ হয়ে গেলো।  হোটেলের নাম এ.বি.। গাড়ি থেকে নামতেই চোখে পড়লো সমুদ্র সৈকত। লবি হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই পরিচয় হলো কয়েকটি বাঙালি পরিবারের সঙ্গে, যারা ঈদের পর ছুটি কাটাতে এসেছেন এখানে। জাতীয় দলের ক্রিকেটার তাজকিন আহমেদ আজ সকাল পর্যন্ত এই হোটেলেই ছিলেন। পরিচয় হলো বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ এক প্রকৌশলীর সঙ্গে। স্ব-পরিবারে যিনি এসেছেন এখানে। হোটেলে সার্বক্ষনিক কাছে পাবেন বিপুল, জাকির, হাসান নামে বেশকিছু বাংলাদেশী কিশোরকে, যারা এখানে ৫ থেকে ৭ বছর ধরে কাজ করে আসছেন। বলে রাখা ভালো সমুদ্রতীরবর্তি হোটেলে না উঠলে লাংকাবি আসাটাই আপনার বোকামী মনে হবে।

যখন তৃতীয় তলার সী-ভিউ হোটেলের কক্ষে প্রবেশ করলাম তখন সন্ধা সাড়ে ছয়টা। তর আর সইছে না। পাঁচ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে স্বস্ত্রীক আমি সমুদ্রে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, সেই সেন্টমার্টিনের স্মৃতিমাখা যাত্রা  শেষে আমরা আবার সমুদ্রে। ভীষণ, ভীষণ ভালো লাগছে।

আন্দামান সমুদ্রের লাংকাবির এই বীচে ঢেউটা একেবারে টলমলে। অনেকটা সেন্টমার্টিনের মতো মনে হবে আপনার। তবে সেন্ট মার্টিনের পানিটা আরো স্বচ্ছ। মালয়েশিয়ানরা এই সমুদ্র আর বীচ নিয়ে সবচেয়ে বেশি গর্ব করে। কারণ আমার ঘুরে দেখা জহুর বাহরু, পেনাং, মালাক্কা, এমনকি সাবাহ, সারওয়াক এর সমুদ্রেও খুব একটা ঢেউ নেই। নেই লম্বা বীচও।

এখানে বেড়াতে আশা বাংলাদেশীরা অকপটেই স্বীকার করলেন এই সমুদ্র ও বীচ আমাদের কক্সবাজারের কাছে কিছুই না। তবে এটা অনেক পরিকল্পিত, যার কারনে এখানকার চতুর্পাশ এত্তো সুন্দর মনে হয়। পরিকল্পনার ছোঁয়া লাগলে আমাদের কক্সবাজারও এর সৌন্দর্যকে হার মানাবে বলে মন্তব্য তাদের। কক্সবাজারের উত্তাল ঢেউ, বিশাল বীচ কোনোটাই নেই এখানে। তবে এখানে যেটা আছে তা হচ্ছে নীল জলরাশির মাঝে খোলা আকাশ, পাহাড় আর সমুদ্রের দারুন একটা সমন্বয়। পরিকল্পনা আর পরিচ্ছন্নতার ছোঁয়া সী-বীচের কোনায় কোনায় খুঁজে পাবেন।

দেখতে দেখতে সন্ধা নামলো। বন্ধ হয়ে গেলো স্পীড বোর্ড, ব্যানানা  বোর্ড প্যারাসুটসহ অন্যান্য যান। এই মূহূর্তে সমুদ্রের মাঝে সূর্য ডোবা দেখতে ইচ্ছে করছে। আবারো মনে পড়ে গেলো প্রিয় মাতৃভূমির অকৃত্রিম সুন্দর কুয়াকাটার কথা। অবহেলা আর অযন্তে যে কুয়াকাটা আজ বিলিন হতে বসেছে।

-
লেখক:  মোস্তফা ইমরান, আরটিভি প্রতিনিধি, মালয়েশিয়া।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

লাংকাবি, মালেশিয়া, কুয়ালালামপুর, পেনাং, পাহাড়, সমুদ্র, দ্বীপ, প্রকৃতি, সৌন্দর্য, ভ্রমণ