সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

0713.jpg

অপুর্ব ভ্রমণ বিরিশিরির রুপ আমি দেখিয়াছি

হলুদাভ গোলাপী রঙের পাহাড়, সবুজাভ লেক, লেকের পানির উপর কুয়াশা ধোয়ার কুন্ডলি পাকিয়ে পেজা তুলার মতো উড়ছে; সবমিলিয়ে এ যেন পৃথিবীর বুকে স্বর্গীয় রুপ।

আমি আর রবিন ভাই সোমেশ্বরী নদীর মাঝখানে দাড়িয়ে আছি। চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢাকা। রবিন ভাই গুগল ম্যাপে কামারখোলা বাজারের পথ খুজছে। এই কামারখোলা বাজার হয়েই আমাদের বিরিশিরির বিজয়পুরের চীনা পাহাড়ে যেতে হবে। সেই ভোরে দুর্গাপুর বাজার থেকে প্রায় পাচ-ছয় কিলো হেটে ফারংপাড়া এসে পৌছেছি। চাইলেই মোটরসাইকেল ভাড়া করে ভু করে বিজয়পুরে চলে যাওয়া যেত। কিন্তু আমরা চেয়েছিলাম ভ্রমণের সম্পূর্ণ থ্রিলটা নিতে। ট্রেকারদের মতো কাধে বড় ব্যাগ ঝুলিয়ে, হাতে ম্যাপ নিয়ে প্রকৃতির রুপ দেখতে দেখতে সামনে এগোনো। 
শীতের অলস গ্রামের অকৃত্রিম সৌন্দর্য্য  উপভোগ করতে করতে আমরা চলে আসলাম কামারপাড়া বাজারের নিকট। সোমেশ্বরী নদীর ওপারেই কামারপাড়া। নদী শুকিয়ে এখন হাটু পানি। চাইলে হেটেই নদী পারি দেওয়া যায়। কিন্তু কে নামবে এই প্রবল শীতে ঠান্ডা জলে? তাই আমরা পারাপারের নৌকায় চরে বসি। নদী ফুরে কুয়াশা ধোয়ার মতো উড়ছে। স্বচ্ছ নদীর জলে আমাদের ছবি ভাসছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর বাইরে আরেক পৃথিবীতে আমরা চলে এসেছি।
নদী পেড়িয়ে যে পাড়ে গেলাম লোকে বলে, কুল্লাপাড়া। কুল্লাপাড়ার সাথেই কামারখোলা বাজার। গোটা দশেক দোকান নিয়ে ছোট্ট বাজার। আমরা বাজারের এক টং ঘরে যাত্রা বিরতী দিলাম। কামারপাড়া থেকে আরও কিছুদূর হাটার পরেই বহেরাতলা। চাররাস্তার মাঝখানে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে রাশিমনি স্মৃতিসৌধ। দেখতে অনেক চোখের মতো। ১৯৪৬ সালে টংক ও কৃষক আন্দোলনের নেত্রী হাজংমাতা রাশিমনি এইখানে শহীদ হন। তার স্মৃতির স্মরণে রাশিমনি স্মৃতিসৌধ। রাশিমনি স্মৃতিসৌধের স্মৃতি ডিজিটাল ক্যামেরায় ক্যামেরাবন্দী করে আমরা আবারও হাটতে থাকি। 
আমাদের ধারণা ছিল, এই সাতসকালে আমরাই সবার আগে বিজয়পুরে পৌছাবে। কিন্তু দেখা গেল, আমাদের আগেই আরেকদল ভ্রমণার্থী বিজয়পুরে হাজির। বউ বাচ্চা নিয়ে ফ্যামিলি প্যাক ট্যুরিস্ট। তাদের দেখা দেখি আমরাও পাহাড়ে উঠা শুরু করলাম। আহামরি বড় পাহাড় না। সহজেই পাহাড়ের মাথায় চড়ে ফেলা যায়।
সাদা পাথরের উপর শ্যাওলা ধরা পাহাড়। কোথাও কোথাও পাহাড়ের রং গোলাপী। ছবি দেখলে যে কেউ অ্যামেরিকার কোন ন্যাড়া পাহাড় ভাবলে আশ্চর্যের কিছু নাই। 
পাহাড়ের বিস্তৃত খুব বেশি জায়গা জুড়ে নয়। আধাঘন্টা হাটলেই সম্পূর্ণ এলাকা ভালোভাবে দেখে নেওয়া যায়। এই পাহাড়গুলো চীনা পাথরের খনি। আর খনিগুলো কাটতে কাটতে পাহাড়ের মাঝখানে গর্ত তৈরি হয়েছে। সেই গর্তে পানি জমে হয়ে গেছে পাহাড়ের মাঝে লেক। লেকের পানি অদ্ভুত রকমের সবুজাভ। এমন অনিন্দ্য সুন্দর লেক আমি এর আগে কোথাও দেখিনি। হলুদাভ গোলাপী রঙের পাহাড়, সবুজাভ লেক, লেকের পানির উপর কুয়াশা ধোয়ার কুন্ডলি পাকিয়ে পেজা তুলার মতো উড়ছে; সবমিলিয়ে এ যেন পৃথিবীর বুকে স্বর্গীয় রুপ।
পাথর কুড়ানো ঠিক না বেঠিক ভাবতে ভাবতে কয়েকটা সাদা আর গোলাপী পাথরের টুকরা সুভিন্যুর হিসেবে ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে ফেললাম। হাতে যেহেতু আমাদের পর্যাপ্ত সময় আছে, আমরা পাহাড়ের উপর বসে সৌন্দর্য্যটা উপভোগ করার চেষ্টা করলাম। মনে ক্ষীণ আসা, হয়তো কুয়াশা কেটে সূর্যমামার দেখা পাওয়া যাবে। তাহলে রোদের আলোয় ঝলমলে পাহাড়ের প্রতিবিম্ব লেকের ভিতর কেমন দেখায়, দেখতে পাবো। আমাদের অপেক্ষাটা বৃথা গেল না। দেখতে দেখতে সূর্যমামা কুয়াশা কাটিয়ে উকি দিয়ে লেকের আয়না জলে তার আজকের চেহারাটা দেখে নিল। আমরা দেখে নিলাম রোদের আলোয় হলুদাভ পাহাড় কেমন দ্যুতি ছড়ায়। নতুন বউয়ের মতো এক পলক দেখা দিয়ে সূর্য আবারও কুয়াশার মেঘে হারিয়ে গেল।
পাহাড়ের পূর্ব দিকে যতদূর চোখ যায়, সবুজের দিগন্তরেখা। তার মাঝখানে মাথা উচু করে দাড়িয়ে দুইটি বটসদৃশ বৃক্ষ। বৃক্ষ দুইটির পাশেই ছনের পালা। দৃশ্যটা ছবির মতো। প্রকৃতি এখানে অলস বসে আছে। আমরাও। কিন্তু কতক্ষণ? কতক্ষণ আর এই চীনা মাটির পাহাড় টিকে থাকবে কে জানে? আমাদের থাকাকালীন একদল ভ্রমণার্থী দেখলাম মটর সাইকেল নিয়ে এখানে আসল।
নেতাগোছের একজন দলের আরেকজনকে জিজ্ঞাস করতে শুনলাম, ‘এমপির খনি কী এইটা?’ সেইজন জবাব দিল, ‘জ্বী। এইটা না। ঔ পাশে।’ বুঝতেই পারলাম। এই এককটা পাহাড়ের খনি একেকজন প্রভাবশালীদের দখল। তাদের কাছে এগুলো শুধুই খনি। অর্থের যোগানদাতা। হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা এই চীনা মাটির পাহাড় কাটা চলছে। খনি আহরণ শেষ হলে একসময় হয়তো সূর্য তার চেহারার দেখার আয়না খুজে পাবে না।
বিরিশিরির মূল আকর্ষণ বিজয়পুরের চীনা পাহাড় হলেও এখানেও আরও কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। যেমন- কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে ভারত সীমান্তে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ, রানীখং গীর্জা, কমলা রংয়ের মন্দির, বিরিশিরিতে ব্যপটিস্টদের গীর্জা। হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকলে, এই দর্শনীয় স্থানগুলো দেখে আসতে পারেন। বিরিশিরিতে ভ্রমণের সবচেয়ে সেরা সময় হচ্ছে শরৎকাল। এই সময় নদী থাকবে টয়টম্বুর। আকাশ থাকবে পেজা তুলায় অলংকৃত নীল। সেই আকাশ সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ নীল জলের ক্যানভাসে মনমুগ্ধকর ছবি আকবে। তবে কুয়াশার চাদরে ঢাকা বিরিশিরির যে রুপ আমরা দেখলাম সেই রুপ অনন্য। 

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

সৌন্দর্য, প্রকৃতি, বিরিশিরি