সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

8077888595_607e24dbb9_b.jpg

নৈসর্গিক সৌন্দর্য রাতারগুল যেন সিলেটের সুন্দরবন

বনের অভ্যন্তরের নীরবতা এতোটাই বিমুগ্ধ করেছিল যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নাম না জানা পাখির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দই কানে আসছিল না। অদ্ভুত সেই অনুভূতি।

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি সিলেট অঞ্চল। নয়নাভিরাম ভূ-প্রকৃতি, পাহাড়-টিলা আর দিগন্ত বিস্তৃত হাওড়ের চোখ ধাঁধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেনো গোটা সিলেট অঞ্চল জুড়ে। এতো দিন লোকচুর কিছুটা অন্তরালে থাকা এমনই এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার সিলেটের রাতারগুল জলাবন।

এটা বাঙলাদেশের একমাত্র জলাবন (Swamp Forest)। সুন্দরবনও জলাবন। তবে সুন্দরবন হচ্ছে লোনা পানির জলাবন; আর রাতারগুল হলো বাঙলাদেশের একমাত্র মিষ্টি পানির জলাবন। দেখতে অনেকটা সুন্দরবনের মতো বলে স্থানীয়ভাবে এই বন “সিলেটের সুন্দরবন” নামেই পরিচিতি পেয়েছে।

“বাঙলাদেশের আমাজন” নামেও পরিচিতি পেয়েছে অনেকের কাছে। শুধু তাই নয় গোটা বিশ্বে যে কয়টি মিষ্টি পানির জলাবন (Fresh Water Swamp Forest) রয়েছে রাতারগুল তার মধ্যে অন্যতম। সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার অবস্থিত এই জলাবন।

মাত্র কিছু দিন আগে স্বস্ত্রীক ঘুরে এলাম দেশের একমাত্র এই জলাবন থেকে। সিলেট শহরে অবস্থিত হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজার শরীফের সম্মুখ হতে ট্যাক্সি ভাড়া করে পৌঁছালাম গোয়াইনঘাট উপজেলার মটরঘাট। সেখান থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় গিয়ে পৌঁছালাম রাতারগুলে। ইঞ্জিন চালিত নৌকা বনে নেয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু আমরা, বিশেষভাবে আমি, সাধারণ ডিঙ্গি নৌকায় একেবারেই অনভ্যস্ত বিধায় নৌকাওয়ালাদের অনেক অনুরোধ করে ইঞ্জিন চালিত নৌকার ব্যবস্থা করতে সম হলাম।

বনে ঢুকে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে পড়ি। জলাবনের বৈশিষ্ট্য হলো বর্ষাকালে এই বন পানিতে ডুবে যায়। কিন্তু এর গাছগুলো পানিতে ডুবে মরে না; বরং আরও সতেজ হয়ে উঠে। মনে হচ্ছিল গাছগুলো যেনো পানিতেই জন্মেছে। প্রায় ২০-৩০ ফুট পানির নিচে ডুবে থাকে গাছগুলো।

নীরবতার যে আলাদা সৌন্দর্য আছে তা টের পেলাম এখানে এসে। চারপাশের সবুজ আর নীরবতা এতটাই মুগ্ধ করেছিলো তা নিজ থেকে উপলদ্ধি না করলে বোঝানো যাবে না। রাতার নামক এক ধরণের গাছ আছে এই বনে প্রচুর পরিমাণে; এর গোল গোল ফল পাখির খুব পছন্দের খাবার। তাই এর নাম রাতারগুল।

বনের অভ্যন্তরের নীরবতা এতোটাই বিমুগ্ধ করেছিল যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নাম না জানা পাখির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দই কানে আসছিল না। অদ্ভুত সেই অনুভূতি। শুনেছিলাম এই বনে প্রচুর সাপ আছে; গাছের ডালে নাকি ঝুলে থাকে। সৌভাগ্যই বলতে হবে, আমাদের কোন সাপের সামনে পড়তে হয়নি। বনের অভ্যন্তরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য আলাদা ডিঙ্গি নৌকা নিলাম। এখানে ঘোরা বলতে পানিতে পানিতেই ঘোরা। জলাবনে ডাঙ্গা বলতে তেমন কিছু নেই।

এই জলাবনের আয়তন ৩,৩২৫.৬১ একর। এর মধ্যে ৫০৪ একর বনাঞ্চলকে ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রানী অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। বর্ষাকালে এই বন অথৈ পানির নীচে ডুবে থাকে প্রায় ৪ মাস। এরপর পানি কিছুটা কমে আসে। বনের মধ্যকার বিভিন্ন ছোটো ছোটো খাল তখন হয়ে যায় পায়ে চলা পথ। আর তখন পানি আটকে থাকে বিলগুলোতে। জলজ প্রাণীও সেখানেই চলে যায় তখন।

বনের হিজল গাছ আছে প্রচুর পরিমানে। অনেক ধরণের পাখির অভয়ারণ্য এই বন। ভাগ্য ভাল থাকলে ঈগল কিংবা শকুনও চোখে পড়তে পারে। এছাড়া অনেক প্রজাতির সাপ, সরীসৃপ ও পতঙ্গও এখানে দেখা যায। হিজল, করচ, তমাল, অর্জুন, কদম, জালিবেত, বনজাম, মুর্তা, পিটালি, জারুল ইত্যাদি নান প্রজাতির উদ্ভিদে সমৃদ্ধ রাতারগুল।

গভীর বনে রয়েছে বানর, নানা প্রজাতির সাপ, বিচ্ছু, মেছোবাঘ, বন্য শূকর, কাঠবিড়ালি, বেজি, ভোঁদড়, বনবিড়াল সহ জল এবং স্থলের বিভিন্ন ধরণের প্রাণী। রয়েছে ঘুঘু, চড়ই, পানকৌড়ি, চিল, বালিহাঁস, বকসহ নানা প্রজাতির পাখি। দেখে মনে হয় আরেক সুন্দরবন। স্বচ্ছ নীলচে পানির ওপর ভাসমান জলাবন রাতারগুল। সবুজ অরণ্যের প্রতিচ্ছবি সম্বলিত নীল জল প্রাণে দোলা দেয়। শীত মৌসুমে বাড়ে অতিথি পাখির আনাগোনা।

প্রায় ঘন্টা দুয়েক ঘোরাফেরার পর তীরে এসে আবার আমরা ইঞ্জিন চালিত নৌকায় উঠে মটরঘাট ফিরে আসি। সেখান থেকে ভাড়া করা ট্যাক্সিতে সিলেট শহরে ফিরি। শহরে ফিরে বাঙলাদেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.) এবং হযরত শাহপরাণ (রহ.) এর দরগাহ শরীফ জিয়ারত শেষে ঢাকায় ফিরে আসি। রাতারগুলের স্মৃতি এখনও মানসপটে উজ্জ্বল।

যেভাবে যাবেন রাতারগুলঃ
প্রথম উপায়: সিলেট থেকে জাফলং-তামাবিল রোডে সারীঘাট হয়ে সরাসরি গোয়াইনঘাট পৌছানো। এরপর গোয়াইনঘাট থেকে রাতারগুল বিট অফিসে আসবার জন্য ট্রলার ভাড়া করতে হবে, ভাড়া ৯০০ – ১৫০০ টাকার মধ্যে (আসা-যাওয়া)। সময় লাগে ২ ঘন্টা। বিট অফিসে নেমে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বনে ঢুকতে হবে। এতে ঘন্টা প্রতি ২০০-৩০০ টাকা লাগবে।

দ্বিতীয় উপায়: সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি নিয়ে গোয়াইনঘাট পৌছানো। ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা। ওসমানী এয়ারপোর্ট – শালুটিকর হয়ে যাওয়া এই রাস্তাটা বর্ষাকালে খুবই সুন্দর। এরপর একইভাবে গোয়াইনঘাট থেকে রাতারগুল বিট অফিসে আসার জন্য ট্রলার ভাড়া করতে হবে, ভাড়া ৮০০ – ১৫০০ এর মধ্যে (আসা – যাওয়া) আর সময় লাগে ২ ঘন্টা। বিট অফিসে নেমে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বনে ঢুকতে হবে, এতে ঘন্টা প্রতি ২০০-৩০০ টাকা লাগবে।

তৃতীয় উপায়: সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি নিয়ে মটরঘাট (সাহেব বাজার হয়ে) পৌছাতে হবে। ভাড়া নেবে ২০০-৩০০ টাকা আর সময় লাগবে ঘন্টাখানেক। এরপর মটরঘাট থেকে সরাসরি ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বনে চলে যাওয়া যায়, এতে ঘন্টা প্রতি ২০০-৩০০ টাকা লাগবে। এই পথেই সময় ও খরচ সবচেয়ে কম।

বন বা তার আশেপাশে খাবার বা থাকার কোন ভালো ব্যবস্থা নেই। তাই খাবার গোয়াইনঘাট বা সিলেট থেকে নিয়ে যেতে হবে। বর্ষাকাল হচ্ছে রাতারগুলে ভ্রমণের সর্বোৎকৃষ্ট সময়। যারা দেশে থেকেই আমাজনের আমেজ পেতে চান, তারা ভ্রমণে যেতে পারেন দেশের একমাত্র এই জলাবনে।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

সুন্দরবন, সিলেট, রাতারগুল, প্রকৃতি, পাখি, জলাবন, ডিঙি-নৌকা, শাপ